ঢাকা ১২:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিদায় দেশনেত্রী: কাঁদো বাংলাদেশ

কামরুজ্জামান বাচ্চু
  • আপডেট সময় : ০১:৩৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৩০৫ বার পড়া হয়েছে

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাউফল ডিগ্রি কলেজ মাঠে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।ওই সময় তিনি ছিলেন বিরোধী দলের নেত্রী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে সক্রিয়।

তার ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতি, প্রশাসনের দলীয়করণ, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তোলেন।এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি আবারও বাউফল সফর করেন।

ওই সময় তিনি পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন আসনে জনসভা করেছিলেন, যার মধ্যে বাউফলের সভাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জনসভায় তিনি ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে জনগণের ভোট চেয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর শুরুর দিকে (সম্ভবত ১৯৯২ বা ১৯৯৩ সালে) তিনি একবার বাউফলের নিম্নাঞ্চল পরিদর্শন বা ত্রাণ বিতরণের জন্য সফরে এসেছিলেন।তাঁর প্রায় প্রতিটি বড় জনসভাই বাউফল সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তাঁর ভাষণে তিনি সব সময়ই বাউফলের কৃষি, উপকূলীয় সুরক্ষা (বেড়িবাঁধ) এবং শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ওই সময় তিনি বাউফল ডিগ্রি কলেজ সরকারি করার ঘোষণা দেন।

ওই জনসভায় বাউফলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা, বিএনপির তৎকালীন নেতা ও পরবর্তীতে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সহিদুল আলম তালুকদার মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও উপজেলা বিএনপির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন না।ওই সময় দৈনিক জনকণ্ঠের বাউফলের নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতাম।

বেগম খালেদা জিয়ার নিউজ কভার করতে আমি কলেজ মাঠে অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম।তখন সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য রেকর্ড করার আধুনিক ডিভাইস বা ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরা বলতে ছিল ফিল্মের ক্যামেরা। ছবি তোলার পর তা ওয়াশ বা প্রিন্ট করতে বরিশালে যেতে হতো। তখন বাউফলে কোনো ডিজিটাল সার্ভিস ছিল না।

যাহোক, আমি বেগম খালেদা জিয়ার ওই সমাবেশের বক্তব্য রেকর্ড করার জন্য আমাদের মাঝারি সাইজের একটি ক্যাসেটচালিত টেপরেকর্ডার নিয়ে সভাস্থলে যাই।

ওই টেপরেকর্ডারটি খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের নজরে পড়ে যায়। তারা আপত্তি তোলেন টেপরেকর্ডার নিয়ে কেন জনসভার মাঠে থাকা যাবে না।

আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও জনসভাস্থলের অনেক বাইরে একটি মাইকের কাছে চলে যাই।বেগম খালেদা জিয়া যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আমি মাইকে প্রচারিত তার ভাষণ আমার টেপরেকর্ডার দিয়ে রেকর্ড করি।

তবে খুশির বিষয় হলো, আমি ফিল্মের ক্যামেরায় খালেদা জিয়ার কাছ থেকে একটি ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনও নিরাপত্তাকর্মীরা আমাকে বাধা দেন। আমি পরিচয়পত্র দেখানোর পর তারা ছবিটি তোলার সুযোগ দেন।যাহোক, এরপর সভা শেষে বাসায় গিয়ে টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করা খালেদা জিয়ার ভাষণ শুনে নিউজ লিখলাম।

এরপর সন্ধ্যায় চলে গেলাম পটুয়াখালী টি অ্যান্ড টি অফিসে। সেখান থেকে অনেক চেষ্টার পর ঢাকা অফিসে নিউজটি ফ্যাক্স করলাম।নিউজ পাঠানোর পর তখন এক ধরনের পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছিলাম।আজ সেই আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই।

মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মৃত্যুর খবর পেয়ে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। তখন চোখের সামনে তার বাউফলে আগমনের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল। বিদায় প্রিয় দেশনেত্রী, কাঁদো বাংলাদেশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বিদায় দেশনেত্রী: কাঁদো বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০১:৩৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাউফল ডিগ্রি কলেজ মাঠে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।ওই সময় তিনি ছিলেন বিরোধী দলের নেত্রী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে সক্রিয়।

তার ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতি, প্রশাসনের দলীয়করণ, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তোলেন।এরপর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি আবারও বাউফল সফর করেন।

ওই সময় তিনি পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন আসনে জনসভা করেছিলেন, যার মধ্যে বাউফলের সভাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জনসভায় তিনি ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে জনগণের ভোট চেয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর শুরুর দিকে (সম্ভবত ১৯৯২ বা ১৯৯৩ সালে) তিনি একবার বাউফলের নিম্নাঞ্চল পরিদর্শন বা ত্রাণ বিতরণের জন্য সফরে এসেছিলেন।তাঁর প্রায় প্রতিটি বড় জনসভাই বাউফল সরকারি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তাঁর ভাষণে তিনি সব সময়ই বাউফলের কৃষি, উপকূলীয় সুরক্ষা (বেড়িবাঁধ) এবং শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ওই সময় তিনি বাউফল ডিগ্রি কলেজ সরকারি করার ঘোষণা দেন।

ওই জনসভায় বাউফলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতা, বিএনপির তৎকালীন নেতা ও পরবর্তীতে পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সহিদুল আলম তালুকদার মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও উপজেলা বিএনপির কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন না।ওই সময় দৈনিক জনকণ্ঠের বাউফলের নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতাম।

বেগম খালেদা জিয়ার নিউজ কভার করতে আমি কলেজ মাঠে অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম।তখন সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য রেকর্ড করার আধুনিক ডিভাইস বা ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরা বলতে ছিল ফিল্মের ক্যামেরা। ছবি তোলার পর তা ওয়াশ বা প্রিন্ট করতে বরিশালে যেতে হতো। তখন বাউফলে কোনো ডিজিটাল সার্ভিস ছিল না।

যাহোক, আমি বেগম খালেদা জিয়ার ওই সমাবেশের বক্তব্য রেকর্ড করার জন্য আমাদের মাঝারি সাইজের একটি ক্যাসেটচালিত টেপরেকর্ডার নিয়ে সভাস্থলে যাই।

ওই টেপরেকর্ডারটি খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের নজরে পড়ে যায়। তারা আপত্তি তোলেন টেপরেকর্ডার নিয়ে কেন জনসভার মাঠে থাকা যাবে না।

আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও জনসভাস্থলের অনেক বাইরে একটি মাইকের কাছে চলে যাই।বেগম খালেদা জিয়া যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আমি মাইকে প্রচারিত তার ভাষণ আমার টেপরেকর্ডার দিয়ে রেকর্ড করি।

তবে খুশির বিষয় হলো, আমি ফিল্মের ক্যামেরায় খালেদা জিয়ার কাছ থেকে একটি ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনও নিরাপত্তাকর্মীরা আমাকে বাধা দেন। আমি পরিচয়পত্র দেখানোর পর তারা ছবিটি তোলার সুযোগ দেন।যাহোক, এরপর সভা শেষে বাসায় গিয়ে টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করা খালেদা জিয়ার ভাষণ শুনে নিউজ লিখলাম।

এরপর সন্ধ্যায় চলে গেলাম পটুয়াখালী টি অ্যান্ড টি অফিসে। সেখান থেকে অনেক চেষ্টার পর ঢাকা অফিসে নিউজটি ফ্যাক্স করলাম।নিউজ পাঠানোর পর তখন এক ধরনের পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছিলাম।আজ সেই আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই।

মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মৃত্যুর খবর পেয়ে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। তখন চোখের সামনে তার বাউফলে আগমনের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠল। বিদায় প্রিয় দেশনেত্রী, কাঁদো বাংলাদেশ।