ঢাকা ০৭:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাঁদাবাজদের খপ্পরে বাউফলের তরমুজ ব্যবসায়ীরা

বিটি ইনভেস্টিগেশন
  • আপডেট সময় : ১০:২৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৯২০ বার পড়া হয়েছে

পটুয়াখালী জেলার বৃহৎ বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর একটি হলো বাউফল উপজেলার সূর্যমনি ইউনিয়নের নুরাইনপুর বাজার। বিশেষ করে নুরাইনপুর লঞ্চঘাট দিয়ে হাজারো মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে বাজারটির নাম শোনা যায়। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু মানুষ মাত্র কয়েক মাসেই চাঁদাবাজি করে কোটিপতি বনে গেছেন।

সরেজমিনে চাঁদাবাজির দৃশ্য

নুরাইনপুর বাজারে তরমুজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদাবাজি হচ্ছে , এমন অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে নামে বাউফল টুডে। গত ২৪ মার্চ সকাল থেকেই বাজারের নুরাইনপুর কলেজ মাঠসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেয় আমাদের প্রতিনিধি দল। এ সময় বেশ কয়েকটি তরমুজবোঝাই ট্রলার মাঠের পাশের খাল দিয়ে ভিড়তে দেখা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এরকম ২০–২৫টি ট্রলার মাঠের পূর্ব প্রান্তে ভিড়েছে। সেখানে দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন সূর্যমনি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহাগ খান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রুবেল ভূঁইয়া, ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি আসাদ মৃধা, বিএনপি নেতা আলতাউল জোমাদ্দারসহ আরও কয়েকজন।

ট্রাক ও ট্রলার প্রতি ৭০০-১০০০ টাকা

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দেখা যায়, একটি ট্রাক থামিয়ে ৭০০ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন সোহাগ খান ও তার সহযোগীরা। এ সময় ২০০ টাকা কম দেওয়ায় চালকের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করতেও দেখা যায় তাকে। বাউফল টুডের ক্যামেরায় হাতেনাতে ধরা পড়ে চাঁদাবাজির এই দৃশ্য। জানতে চাইলে শুরু হয় নানা ধরনের ছলচাতুরী। সোহাগ জানান, “দিন-রাত পাহারা দেই, এইটুকু আমাদের পাওনা। আমরা এই তরমুজের দেখাশোনা করি।” এ সময় তিনি কয়েকবার বাউফল টুডেকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। ৭০০ টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আগে আরও বেশি নেওয়া হতো, এখন তুলনামূলক কম নেওয়া হচ্ছে। তাদের ঘাট ইজারা নেওয়া আছে, তাই তারা টাকা আদায় করতে পারেন বলেও দাবি করেন।

এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রলারচালক ও ব্যবসায়ী জানান, কোনো ট্রলার ঘাটে ভিড়লেই ১,০০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় এবং প্রতি ট্রাক থেকে নেওয়া হয় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। সেনাবাহিনী একবার অভিযান চালালে টাকার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। তারা এই চাঁদাবাজির অবসান চান বলেও জানিয়েছেন।

নেপথ্যে বিএনপি নেতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, সূর্যমনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব জমাদ্দার এই চাঁদাবাজির মূল হোতা। তার প্রত্যক্ষ মদতেই অবাধে এই চাঁদাবাজি চলছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাহাবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা কম টাকা নিচ্ছি।” তিনি দাবি করেন, কাগজে উল্লেখ আছে যে তিনি ঘাটের ৫০০ গজের মধ্যে ইজারা নিতে পারবেন, তাই তিনি নিয়েছেন। যদিও বাস্তবে সেই দূরত্ব অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রতি ট্রাক ও ট্রলারে দুই-তিন হাজার তরমুজ ওঠে, সেখানে ৫০০–৬০০ টাকা বেশি নয়, বরং কমই। তিনি আরও দাবি করেন, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে কলেজ মাঠের পাশে ট্রলার ভেড়ানো ও ট্রাক চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন। তবে একটি খেলার মাঠ নষ্ট করে ট্রাক চলাচলের অনুমতি দেওয়া যায় কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বক্তব্য পরিবর্তন করেন। এদিকে ঘাট ইজারার চুক্তিপত্র দেখতে চাইলে মাহাবুব জানান, তাকে কোনো চুক্তিপত্র দেওয়া হয়নি; তার কাছে কেবল একটি অনুমোদনপত্র রয়েছে। যদিও সেখানে চুক্তি সম্পাদনের কথা উল্লেখ রয়েছে, তবুও তার কাছে কোনো চুক্তিপত্র নেই। যদিও আইন অনুযায়ী, চুক্তিপত্র ছাড়া ইজারা চলতে পারে না।

এদিকে, সেসময় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ক্যাপ্টেন বাউফল টুডেকে জানান, সেনাবাহিনী ওই এলাকায় চাঁদাবাজির বিষয়ে অবগত নয়। তারা নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

চাঁদাবাজদের খপ্পরে বাউফলের তরমুজ ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় : ১০:২৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

পটুয়াখালী জেলার বৃহৎ বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর একটি হলো বাউফল উপজেলার সূর্যমনি ইউনিয়নের নুরাইনপুর বাজার। বিশেষ করে নুরাইনপুর লঞ্চঘাট দিয়ে হাজারো মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে বাজারটির নাম শোনা যায়। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু মানুষ মাত্র কয়েক মাসেই চাঁদাবাজি করে কোটিপতি বনে গেছেন।

সরেজমিনে চাঁদাবাজির দৃশ্য

নুরাইনপুর বাজারে তরমুজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদাবাজি হচ্ছে , এমন অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে নামে বাউফল টুডে। গত ২৪ মার্চ সকাল থেকেই বাজারের নুরাইনপুর কলেজ মাঠসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেয় আমাদের প্রতিনিধি দল। এ সময় বেশ কয়েকটি তরমুজবোঝাই ট্রলার মাঠের পাশের খাল দিয়ে ভিড়তে দেখা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এরকম ২০–২৫টি ট্রলার মাঠের পূর্ব প্রান্তে ভিড়েছে। সেখানে দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন সূর্যমনি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহাগ খান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রুবেল ভূঁইয়া, ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি আসাদ মৃধা, বিএনপি নেতা আলতাউল জোমাদ্দারসহ আরও কয়েকজন।

ট্রাক ও ট্রলার প্রতি ৭০০-১০০০ টাকা

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দেখা যায়, একটি ট্রাক থামিয়ে ৭০০ টাকা চাঁদা নিচ্ছেন সোহাগ খান ও তার সহযোগীরা। এ সময় ২০০ টাকা কম দেওয়ায় চালকের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করতেও দেখা যায় তাকে। বাউফল টুডের ক্যামেরায় হাতেনাতে ধরা পড়ে চাঁদাবাজির এই দৃশ্য। জানতে চাইলে শুরু হয় নানা ধরনের ছলচাতুরী। সোহাগ জানান, “দিন-রাত পাহারা দেই, এইটুকু আমাদের পাওনা। আমরা এই তরমুজের দেখাশোনা করি।” এ সময় তিনি কয়েকবার বাউফল টুডেকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন। ৭০০ টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আগে আরও বেশি নেওয়া হতো, এখন তুলনামূলক কম নেওয়া হচ্ছে। তাদের ঘাট ইজারা নেওয়া আছে, তাই তারা টাকা আদায় করতে পারেন বলেও দাবি করেন।

এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রলারচালক ও ব্যবসায়ী জানান, কোনো ট্রলার ঘাটে ভিড়লেই ১,০০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় এবং প্রতি ট্রাক থেকে নেওয়া হয় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা। সেনাবাহিনী একবার অভিযান চালালে টাকার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়। তারা এই চাঁদাবাজির অবসান চান বলেও জানিয়েছেন।

নেপথ্যে বিএনপি নেতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, সূর্যমনি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব জমাদ্দার এই চাঁদাবাজির মূল হোতা। তার প্রত্যক্ষ মদতেই অবাধে এই চাঁদাবাজি চলছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাহাবুবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা কম টাকা নিচ্ছি।” তিনি দাবি করেন, কাগজে উল্লেখ আছে যে তিনি ঘাটের ৫০০ গজের মধ্যে ইজারা নিতে পারবেন, তাই তিনি নিয়েছেন। যদিও বাস্তবে সেই দূরত্ব অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, প্রতি ট্রাক ও ট্রলারে দুই-তিন হাজার তরমুজ ওঠে, সেখানে ৫০০–৬০০ টাকা বেশি নয়, বরং কমই। তিনি আরও দাবি করেন, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে কলেজ মাঠের পাশে ট্রলার ভেড়ানো ও ট্রাক চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন। তবে একটি খেলার মাঠ নষ্ট করে ট্রাক চলাচলের অনুমতি দেওয়া যায় কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বক্তব্য পরিবর্তন করেন। এদিকে ঘাট ইজারার চুক্তিপত্র দেখতে চাইলে মাহাবুব জানান, তাকে কোনো চুক্তিপত্র দেওয়া হয়নি; তার কাছে কেবল একটি অনুমোদনপত্র রয়েছে। যদিও সেখানে চুক্তি সম্পাদনের কথা উল্লেখ রয়েছে, তবুও তার কাছে কোনো চুক্তিপত্র নেই। যদিও আইন অনুযায়ী, চুক্তিপত্র ছাড়া ইজারা চলতে পারে না।

এদিকে, সেসময় সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ক্যাপ্টেন বাউফল টুডেকে জানান, সেনাবাহিনী ওই এলাকায় চাঁদাবাজির বিষয়ে অবগত নয়। তারা নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করেছে।