ঢাকা ০৫:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাউফলে ভিটা মাটি ছাড়ার আতঙ্কে ৩০ হিন্দু পরিবার

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : ১২:০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
  • / ৪৯১ বার পড়া হয়েছে
পটুয়াখালীর বাউফলের ধুলিয়া ইউনিয়নের ঘুরচাকাঠী গ্রামে ৩০টি হিন্দু পরিবারের জমি দখলের হুমকি দিয়ে  ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের পায়তারা করছে। এরফলে ওই পরিবারগুলো এখন উচ্ছেদ  আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ।
সরেজমিন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র থেকে জানা গেছে,  হারুন কারী ও তার পরিবার এলাকায় ভূমি দস্যু নামে পরিচিত। গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমিজমা দখলে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
ঘুরচাকাঠী গ্রামে দীর্ঘকাল  ধরে অর্ধশত হিন্দু পরিবার বসবাস করে আসছেন। এসব হিন্দু পরিবারের জমিজমা, ভিটে মাটি দখলে নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠে হারুন কারী ও তার পরিবারের লোকজন। ২০২১ সালে  নরেন রক্ষিতকে ভয়ভীতি দেখিয়ে  প্রায় ৩ একর জমির  অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা দলিল বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি  নেয় হারুন  কারী ও তার ভাই কাদের কারী।  পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জোরে নরেন রক্ষিতের  ঘর বাড়ি দখল করে নেন হারুন ও তার লোকজন। এরপর তাদের হুমকিরমুখে প্রাণ ভয়ে এলাকা থেকে ভারতে পালিয়ে যান নরেন রক্ষিতৎ ও তার  পরিবার।
এরপর  থেকে ওই এলাকার হিন্দু পরিবার গুলোর জমি দখলের মিশনে নামে হারুন কারী। হিন্দুদের বসতবাড়ী  ফসলি জমিজমা ভূয়া কাগজপত্র তৈনি করে  বিভিন্ন মানুষের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন   তিনি । কেউ স্বেচ্ছা এলাকা ত্যাগ করতে না চাইলে তাদেরকে অত্যাচার নির্যাতন করতো হারুনকারী ও তার পেষ্য বাহিনী । শুধু তাই নয় হারুন কারীর ও তার বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন অনেক মুসলিম পরিবারও।
শিউলী রাণী ওঝা নামে এক ভুক্তভোগী বলেন,‘ নদী ভাঙনে ভিটে মাটি সব হারিয়েছি।  ২১ বছর আগে ঘুরচাকাঠী গ্রামে কিছু জমি কিনে ঘরবাড়ি করে বসবাস করে আসছি। গত বছর  হারুন কারী আমাদের বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কয়েকদিন আগে আবারও বাড়ি এসে হুমকি দিয়ে দেড় লাখ টাকা দাবি করেছেন। টাকা না দিলে আমাদের জমিতে মসজিদ বানানোর হুমকি দিয়েছেন হারুন।’
হারুন কারীর অত্যাচারে শিকার সুনিল রক্ষিৎ নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার পৈত্রিক সম্পত্তি। যুগ যুগ ধরে আমরা ভোগদখল করে আসছি। ভূমি দস্যু হারুন কারী ভূয়া ওয়ারিশ নামা দিয়ে  নরেন রক্ষিতের কাছ থেকে জোর করে পাওয়ার নিয়ে আমাদের ঘর বাড়ি জমি জমা দখল নিতে চায়।  প্রতিবাদ করলে  সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে আমাদের নির্যাতন করে। ধারালো অস্ত্র লাঠি সোটা নিয়ে হামলা করে।’
চয়ন কুমার লিটন রক্ষিত বলেন, ‘ দীর্ঘদিন ধরে হারুন কারী হিন্দুদের জমিজমা দখলে নেওয়ার পায়তারা করে আসছিলেন।   তিন বছর আগে তৎকালীন চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশকে ম্যানেজ করে একটি ভূয়া ওয়ারিশ সনদপত্র বের করেন। সেই ভূয়া বানোয়াট ওয়ারিশ সনদ দিয়ে নরেন রক্ষিতের কাছ থেকে জোর করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেন। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার পর নরেন রক্ষিতকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। এরপর থেকে হিন্দুদের জমি দখলে  মরিয়া  হয়ে উঠে হারুন ও তার পরিবার। হারুনের অত্যাচার নির্যাতন হুমকিতে হিন্দুরা  মানবেতর জীবন যাপন করছেন।’
একই ভাবে হিন্দু পাড়ার সুভাষ রাঢ়ী, করুন বৃত ঘরামী, আরতী রানী, বিমল হাওলাদার, খুকু রানী, কল্পনা রানী সহ প্রায় ৩০টি পরিবার হারুন কারীর অত্যাচার নির্যাতনের শিকার। এসব পরিবারের মানুষেরা প্রতিনিয়িত হারুনের আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এ ব্যাপারে হারুন কারী তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোন হিন্দুদের সম্পত্তি জোর করে দখল করিনি। তাদেরকে ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের ভয়ভীতি দেখাইনি। কিছু সম্পত্তি আমি বৈধ ভাবে ক্রয় করেচি। আমার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মু. হুমায়ন কবির বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান একটি ওয়ারিশ সনদপত্র দিয়েছিলেন। যেখানে দেবেন্দ্র চন্দ্র রক্ষিতের একমাত্র ওয়ারিশ দাবি করা হয়েছে তার দ্বিতীয় পূত্র নরেন রক্ষিতকে । যদিও দেবেন্দ্র চন্দের ৫ছেলে। বিষয়টি আমি জানার পরে গ্রামে তদন্ত করে সঠিক ওয়ারিশ সনদপত্র দিয়েছি।’
এবিষয়ে  উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বশির গাজী বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। পুলিশ বিষয়টির তদন্ত করে দেখা হবে।’
বাউফল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শোনিত কুমার গায়েন বলেন, ‘সরেজমিনে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি হয়েছে। আর যেহেতু বিষয়টি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, তাই এটি পুলিশের নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই। এটি আদালত দেখবেন।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

বাউফলে ভিটা মাটি ছাড়ার আতঙ্কে ৩০ হিন্দু পরিবার

আপডেট সময় : ১২:০৪:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
পটুয়াখালীর বাউফলের ধুলিয়া ইউনিয়নের ঘুরচাকাঠী গ্রামে ৩০টি হিন্দু পরিবারের জমি দখলের হুমকি দিয়ে  ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের পায়তারা করছে। এরফলে ওই পরিবারগুলো এখন উচ্ছেদ  আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ।
সরেজমিন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র থেকে জানা গেছে,  হারুন কারী ও তার পরিবার এলাকায় ভূমি দস্যু নামে পরিচিত। গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমিজমা দখলে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
ঘুরচাকাঠী গ্রামে দীর্ঘকাল  ধরে অর্ধশত হিন্দু পরিবার বসবাস করে আসছেন। এসব হিন্দু পরিবারের জমিজমা, ভিটে মাটি দখলে নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠে হারুন কারী ও তার পরিবারের লোকজন। ২০২১ সালে  নরেন রক্ষিতকে ভয়ভীতি দেখিয়ে  প্রায় ৩ একর জমির  অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা দলিল বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি  নেয় হারুন  কারী ও তার ভাই কাদের কারী।  পাওয়ার অব অ্যাটর্নির জোরে নরেন রক্ষিতের  ঘর বাড়ি দখল করে নেন হারুন ও তার লোকজন। এরপর তাদের হুমকিরমুখে প্রাণ ভয়ে এলাকা থেকে ভারতে পালিয়ে যান নরেন রক্ষিতৎ ও তার  পরিবার।
এরপর  থেকে ওই এলাকার হিন্দু পরিবার গুলোর জমি দখলের মিশনে নামে হারুন কারী। হিন্দুদের বসতবাড়ী  ফসলি জমিজমা ভূয়া কাগজপত্র তৈনি করে  বিভিন্ন মানুষের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন   তিনি । কেউ স্বেচ্ছা এলাকা ত্যাগ করতে না চাইলে তাদেরকে অত্যাচার নির্যাতন করতো হারুনকারী ও তার পেষ্য বাহিনী । শুধু তাই নয় হারুন কারীর ও তার বাহিনীর অত্যাচারের শিকার হয়েছেন অনেক মুসলিম পরিবারও।
শিউলী রাণী ওঝা নামে এক ভুক্তভোগী বলেন,‘ নদী ভাঙনে ভিটে মাটি সব হারিয়েছি।  ২১ বছর আগে ঘুরচাকাঠী গ্রামে কিছু জমি কিনে ঘরবাড়ি করে বসবাস করে আসছি। গত বছর  হারুন কারী আমাদের বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কয়েকদিন আগে আবারও বাড়ি এসে হুমকি দিয়ে দেড় লাখ টাকা দাবি করেছেন। টাকা না দিলে আমাদের জমিতে মসজিদ বানানোর হুমকি দিয়েছেন হারুন।’
হারুন কারীর অত্যাচারে শিকার সুনিল রক্ষিৎ নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার পৈত্রিক সম্পত্তি। যুগ যুগ ধরে আমরা ভোগদখল করে আসছি। ভূমি দস্যু হারুন কারী ভূয়া ওয়ারিশ নামা দিয়ে  নরেন রক্ষিতের কাছ থেকে জোর করে পাওয়ার নিয়ে আমাদের ঘর বাড়ি জমি জমা দখল নিতে চায়।  প্রতিবাদ করলে  সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে আমাদের নির্যাতন করে। ধারালো অস্ত্র লাঠি সোটা নিয়ে হামলা করে।’
চয়ন কুমার লিটন রক্ষিত বলেন, ‘ দীর্ঘদিন ধরে হারুন কারী হিন্দুদের জমিজমা দখলে নেওয়ার পায়তারা করে আসছিলেন।   তিন বছর আগে তৎকালীন চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশকে ম্যানেজ করে একটি ভূয়া ওয়ারিশ সনদপত্র বের করেন। সেই ভূয়া বানোয়াট ওয়ারিশ সনদ দিয়ে নরেন রক্ষিতের কাছ থেকে জোর করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেন। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেওয়ার পর নরেন রক্ষিতকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। এরপর থেকে হিন্দুদের জমি দখলে  মরিয়া  হয়ে উঠে হারুন ও তার পরিবার। হারুনের অত্যাচার নির্যাতন হুমকিতে হিন্দুরা  মানবেতর জীবন যাপন করছেন।’
একই ভাবে হিন্দু পাড়ার সুভাষ রাঢ়ী, করুন বৃত ঘরামী, আরতী রানী, বিমল হাওলাদার, খুকু রানী, কল্পনা রানী সহ প্রায় ৩০টি পরিবার হারুন কারীর অত্যাচার নির্যাতনের শিকার। এসব পরিবারের মানুষেরা প্রতিনিয়িত হারুনের আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এ ব্যাপারে হারুন কারী তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোন হিন্দুদের সম্পত্তি জোর করে দখল করিনি। তাদেরকে ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদের ভয়ভীতি দেখাইনি। কিছু সম্পত্তি আমি বৈধ ভাবে ক্রয় করেচি। আমার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
ধুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মু. হুমায়ন কবির বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যান একটি ওয়ারিশ সনদপত্র দিয়েছিলেন। যেখানে দেবেন্দ্র চন্দ্র রক্ষিতের একমাত্র ওয়ারিশ দাবি করা হয়েছে তার দ্বিতীয় পূত্র নরেন রক্ষিতকে । যদিও দেবেন্দ্র চন্দের ৫ছেলে। বিষয়টি আমি জানার পরে গ্রামে তদন্ত করে সঠিক ওয়ারিশ সনদপত্র দিয়েছি।’
এবিষয়ে  উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ বশির গাজী বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। পুলিশ বিষয়টির তদন্ত করে দেখা হবে।’
বাউফল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শোনিত কুমার গায়েন বলেন, ‘সরেজমিনে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলার অবনতি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি হয়েছে। আর যেহেতু বিষয়টি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, তাই এটি পুলিশের নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই। এটি আদালত দেখবেন।’