ঢাকা ০৮:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কবর ভেঙে বেরিয়ে আসছে কঙ্কাল, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে দিশেহারা মানুষ

সিফাদ জামান আয়ান
  • আপডেট সময় : ০৫:৩০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২০৭ বার পড়া হয়েছে

Screenshot

বেরিয়ে এসেছে মানুষের কঙ্কাল। বসতঘর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে অন্যত্র। অনেকেই বসতঘর হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর আগ্রাসী ভাঙনে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন নদীবেষ্টিত একাধিক ইউনিয়নের মানুষ।

বিশেষ করে উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর ব্যারেট গ্রামসহ বিশাল এলাকা প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে ভয়াল তেঁতুলিয়া।
​নদীর করাল গ্রাসে ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে শত শত পরিবারের ভিটেমাটি ও স্বজনদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন পারিবারিক কবরস্থানগুলো। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে গৃহহারা পরিবারগুলো ভাঙনের আগেই তড়িঘড়ি করে নিজেদের ঘড়বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন।

​সরেজমিনে চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণ চর ব্যারেট গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নদীর তীরে চৌকিদার বাড়ির অদূরে ধসে পড়া পারিবারিক কবরস্থান থেকে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে রয়েছে নদীর পাড়ে। তবে কঙ্কালটি কার কিংবা কোন পরিবারের, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি স্থানীয় কেউ। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ওই এলাকার বাড়িঘরের আর কোনো চিহ্ন না থাকায় এমনকি নিকটবর্তী চৌকিদার বাড়ির বাসিন্দারাও এর পরিচয় সনাক্ত করতে পারেননি।

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দশক ধরে তেঁতুলিয়া নদীর বিধ্বংসী ভাঙনে ধুলিয়া, কেশবপুর, নাজিরপুর, কালাইয়া এবং চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ৮/১০ হাজারেরও বেশি বসতঘর, কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি, পাকা ও কাঁচা সড়ক, ণেড়িবাধসহ নানা স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে।

বর্তমানেও ভাঙনের তীব্রতা অব্যাহত থাকলেও সরকারি উদ্যোগে এখন পর্যন্ত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। কোনো কোনো পয়েন্টে অতীতে জিও ব্যাগে বালু ফেলা হলেও তার সিংহভাগই নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন-রাত পার করছেন।

​নাজিরপুর ইউনিয়নের বড় ডালিমা গ্রামের ইউপি সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ডালিমা ও নিমদি পয়েন্টে তেঁতুলিয়ার অব্যাহত ভাঙনে একটি পাকা সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। অবিলম্বে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ করা না গেলে ডালিমা ও নিমদি গ্রাম দুটি অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

​চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা জালাল সরদার আক্ষেপ করে বলেন, “তেঁতুলিয়া নদী শুধু পশ্চিম পাড়ই ভাঙছে না, নদীর মধ্যবর্তী পূর্ব পাড়ের খেয়াঘাট এলাকা, দক্ষিণ চর ব্যারেট ও বেড়িবাঁধসহ বিশাল জনপদ গিলে খেয়েছে। নিঃস্ব হয়ে পড়া বহু পরিবার তাঁদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।”

​এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ জানান, সম্প্রতি পটুয়াখালী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান তেঁতুলিয়া নদীর নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলো সশরীরে পরিদর্শন করেছেন এবং ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমরান হোসেনকে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ডিসি অফিসে মিটিংএ আছেন।

বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন, তেঁতুলিয়া নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকাগুলোতে বালুভ ভর্তি জিও ব্যাক খেলা হয়েছে। যেসব এলাকার নতুন করে ভাঙছে সেখানেও পদক্ষেপ নেয়া হবে। ইতিমধ্যে ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য ধুলিয়া এলাকাশ ব্লোক বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড় ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

​এদিকে বাউফলের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, নদীভাঙন রোধ ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য তিনি একাধিকবার পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি নিজে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।

​প্রতিনিয়ত জমিজমা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে নিঃস্ব হতে বসা নদীপাড়ের মানুষগুলোর এখন আকুল আকুতি কাগজে-কলমে আশ্বাস নয়, অবিলম্বে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।

​

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

কবর ভেঙে বেরিয়ে আসছে কঙ্কাল, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে দিশেহারা মানুষ

আপডেট সময় : ০৫:৩০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বেরিয়ে এসেছে মানুষের কঙ্কাল। বসতঘর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে অন্যত্র। অনেকেই বসতঘর হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর আগ্রাসী ভাঙনে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন নদীবেষ্টিত একাধিক ইউনিয়নের মানুষ।

বিশেষ করে উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর ব্যারেট গ্রামসহ বিশাল এলাকা প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে ভয়াল তেঁতুলিয়া।
​নদীর করাল গ্রাসে ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে শত শত পরিবারের ভিটেমাটি ও স্বজনদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন পারিবারিক কবরস্থানগুলো। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে গৃহহারা পরিবারগুলো ভাঙনের আগেই তড়িঘড়ি করে নিজেদের ঘড়বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার আকুল চেষ্টা করছেন।

​সরেজমিনে চন্দ্রদ্বীপের দক্ষিণ চর ব্যারেট গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নদীর তীরে চৌকিদার বাড়ির অদূরে ধসে পড়া পারিবারিক কবরস্থান থেকে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে রয়েছে নদীর পাড়ে। তবে কঙ্কালটি কার কিংবা কোন পরিবারের, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি স্থানীয় কেউ। নদীগর্ভে বিলীন হওয়া ওই এলাকার বাড়িঘরের আর কোনো চিহ্ন না থাকায় এমনকি নিকটবর্তী চৌকিদার বাড়ির বাসিন্দারাও এর পরিচয় সনাক্ত করতে পারেননি।

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দশক ধরে তেঁতুলিয়া নদীর বিধ্বংসী ভাঙনে ধুলিয়া, কেশবপুর, নাজিরপুর, কালাইয়া এবং চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ৮/১০ হাজারেরও বেশি বসতঘর, কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি, পাকা ও কাঁচা সড়ক, ণেড়িবাধসহ নানা স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে।

বর্তমানেও ভাঙনের তীব্রতা অব্যাহত থাকলেও সরকারি উদ্যোগে এখন পর্যন্ত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। কোনো কোনো পয়েন্টে অতীতে জিও ব্যাগে বালু ফেলা হলেও তার সিংহভাগই নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন-রাত পার করছেন।

​নাজিরপুর ইউনিয়নের বড় ডালিমা গ্রামের ইউপি সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ডালিমা ও নিমদি পয়েন্টে তেঁতুলিয়ার অব্যাহত ভাঙনে একটি পাকা সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। অবিলম্বে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ করা না গেলে ডালিমা ও নিমদি গ্রাম দুটি অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

​চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা জালাল সরদার আক্ষেপ করে বলেন, “তেঁতুলিয়া নদী শুধু পশ্চিম পাড়ই ভাঙছে না, নদীর মধ্যবর্তী পূর্ব পাড়ের খেয়াঘাট এলাকা, দক্ষিণ চর ব্যারেট ও বেড়িবাঁধসহ বিশাল জনপদ গিলে খেয়েছে। নিঃস্ব হয়ে পড়া বহু পরিবার তাঁদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।”

​এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ জানান, সম্প্রতি পটুয়াখালী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান তেঁতুলিয়া নদীর নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলো সশরীরে পরিদর্শন করেছেন এবং ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমরান হোসেনকে ফোন দেয়া হলে তিনি বলেন, ডিসি অফিসে মিটিংএ আছেন।

বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন, তেঁতুলিয়া নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকাগুলোতে বালুভ ভর্তি জিও ব্যাক খেলা হয়েছে। যেসব এলাকার নতুন করে ভাঙছে সেখানেও পদক্ষেপ নেয়া হবে। ইতিমধ্যে ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য ধুলিয়া এলাকাশ ব্লোক বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড় ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

​এদিকে বাউফলের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, নদীভাঙন রোধ ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য তিনি একাধিকবার পানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি নিজে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা পেশ করেছেন।

​প্রতিনিয়ত জমিজমা ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে নিঃস্ব হতে বসা নদীপাড়ের মানুষগুলোর এখন আকুল আকুতি কাগজে-কলমে আশ্বাস নয়, অবিলম্বে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে একটি স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।

​